মাইক্রোওয়েভ কুকিং হ্যাকস

একজন ব্যক্তি মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে একটি সম্পূর্ণ ও সুস্বাদু ডিশ রান্না করছেন।

মাইক্রোওয়েভ কুকিং হ্যাকস: রান্নাকে সহজ করার কার্যকরী টিপস

মাইক্রোওয়েভ শুধু খাবার গরম করার যন্ত্র নয়, এটি হতে পারে আপনার রান্নার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকারী। সঠিক পদ্ধতি জানলে এই সাধারণ যন্ত্রটি দিয়েই আপনি তৈরি করতে পারেন অসাধারণ সব খাবার। আসুন জেনে নিই কিছু কার্যকরী মাইক্রোওয়েভ কুকিং হ্যাকস।

ভূমিকা: মাইক্রোওয়েভ রান্নার অপার সম্ভাবনা

অনেকের ধারণা মাইক্রোওয়েভ শুধুই ফাস্ট ফুড গরম করার যন্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। সঠিক টেকনিক জানা থাকলে মাইক্রোওয়েভে আপনি তৈরি করতে পারেন স্বাস্থ্যকর, সুস্বাদু এবং সব খাবার। সময় বাঁচানো থেকে শুরু করে পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ—মাইক্রোওয়েভ রান্নার রয়েছে নানা সুবিধা।

প্রাথমিক প্রস্তুতি: সঠিক সরঞ্জাম নির্বাচন

উপযুক্ত পাত্র বাছাই

মাইক্রোওয়েভ রান্নার সাফল্য  নির্ভর করে সঠিক পাত্র নির্বাচনের উপর। কাচ, সিরামিক এবং মাইক্রোওয়েভ-সেইফ প্লাস্টিকের পাত্র। পাত্র নির্বাচন করার সময় মনে রাখবেন, গোলাকার পাত্রের চেয়ে আয়তাকার পাত্রে খাবার বেশি সমানভাবে রান্না হয়।

ঢাকনার গুরুত্ব

মাইক্রোওয়েভ রান্নায় ঢাকনার ভূমিকা অপরিসীম। এটি খাবারকে সমানভাবে রান্না হতে সাহায্য করে, পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ করে এবং মাইক্রোওয়েভ পরিষ্কার রাখে। তবে ঢাকনা খুব শক্ত করে বন্ধ করবেন না, বাষ্প বের হওয়ার জন্য sedikit জায়গা রাখুন।

সবজি রান্নার হ্যাকস

মাইক্রোওয়েভে ভাপে রান্না করা রঙিন ও সতেজ সবজি।

পাতাসবজি রান্না

পালং শাক, লেটুস বা অন্য কোনো পাতাসবজি রান্না করতে চাইলে একটি বড় মাইক্রোওয়েভ-সেইফ বাটি নিন। সবজিগুলো ভালোভাবে ধুয়ে বাটিতে রাখুন, উপরে এক টেবিল চামচ পানি দিন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন। দুই থেকে তিন মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন। এই পদ্ধতিতে সবজি তার প্রাকৃতিক রং এবং পুষ্টিগুণ ধরে রাখে।

শক্ত সবজি রান্না

গাজর, আলু বা ফুলকপির মতো শক্ত সবজি রান্না করতে চাইলে প্রথমে সেগুলো ছোট টুকরো করে কাটুন। একটি বাটিতে রাখুন, প্রয়োজনমতো পানি দিন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে নিন। প্রতি এক কাপ সবজির জন্য চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় দিন। রান্নার মাঝে একবার নেড়ে দিন।

ভাপে সবজি রান্না

মাইক্রোওয়েভে ভাপে সবজি রান্না করার জন্য একটি বিশেষ টেকনিক আছে। একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ প্লেটে সবজি সাজান, তারপর আরেকটি প্লেট উল্টো করে ঢেকে দিন। এই পদ্ধতিতে সবজি তার প্রাকৃতিক রসেই রান্না হয় এবং খেতে হয় খুবই সতেজ।

ডিম রান্নার কার্যকরী পদ্ধতি

স্ক্র্যাম্বলড এগ

একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ বাটিতে দুইটি ডিম ভেঙে নিন। প্রয়োজনমতো লবণ, মরিচ এবং অন্যান্য মসলা যোগ করুন। একটি চামচ দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। বাটিটি মাইক্রোওয়েভে রাখুন এবং ৩০ সেকেন্ড পর পর নেড়ে দিন। মোট এক থেকে দেড় মিনিটে আপনার স্ক্র্যাম্বলড এগ তৈরি হয়ে যাবে।

পোচড এগ

মাইক্রোওয়েভে একটি মগের মধ্যে তৈরি একটি পারফেক্ট পোচড এগ।

একটি মগে আধা কাপ পানি নিন, তারপর একটি ডিম ভেঙে পানির মধ্যে দিন। মগের উপরে একটি প্লেট দিয়ে ঢেকে দিন। এক মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন। প্রয়োজন হলে আরও ৩০ সেকেন্ড দিন। পানিটি ছেঁকে নিলেই পোচড এগ তৈরি।

অমলেট

একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ প্লেটে অল্প তেল দিয়ে গ্রিজ করুন। ডিমের মিশ্রণটি প্লেটে ঢালুন এবং উপরে প্রিয় সবজি কিংবা চিজ দিয়ে সাজান। দুই মিনিট মিডিয়াম পাওয়ারে রান্না করুন। মাঝে একবার নেড়ে দিন।

মাংস রান্নার বিশেষ টিপস

চিকেন ব্রেস্ট

মাইক্রোওয়েভে চিকেন ব্রেস্ট রান্না করতে চাইলে প্রথমে মাংসগুলো সমান পুরুত্বের টুকরো করে কাটুন। একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ ডিশে সাজান, উপরে প্রয়োজনীয় মসলা এবং এক টেবিল চামচ পানি দিন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে তিন থেকে চার মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন। রান্নার মাঝে একবার উল্টে দিন।

গ্রিলড মাংস

মাইক্রোওয়েভে গ্রিলড মাংসের স্বাদ পেতে বিশেষ গ্রিলিং র্যাক ব্যবহার করুন। মাংসে ম্যারিনেট করে র্যাকের উপর সাজান। মিডিয়াম-হাই পাওয়ারে রান্না করুন, প্রতি পাশ দুই থেকে তিন মিনিট। এই পদ্ধতিতে মাংসের অতিরিক্ত চর্বি ঝরে যায় এবং স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না হয়।

মাংস নরম করার টিপস

কঠিন মাংস নরম করতে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করতে পারেন। মাংসের টুকরোগুলো একটি বাটিতে রাখুন, উপরে এক চা চামচ ভিনেগার বা লেবুর রস দিন। ৩০ সেকেন্ড মিডিয়াম পাওয়ারে গরম করুন। এই পদ্ধতিতে মাংস দ্রুত নরম হবে।

ভাত এবং পাস্তা রান্না

পরিপূর্ণ ভাত রান্না

এক কাপ ভাতের জন্য দেড় কাপ পানি নিন। একটি বড় মাইক্রোওয়েভ-সেইফ বাটিতে ভাত এবং পানি দিন, লবণ যোগ করুন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে নিন। ১০ মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন, তারপর পাঁচ মিনিট রেখে দিন। এই সময়ে ভাত সম্পূর্ণভাবে রান্না হবে এবং ফুলে উঠবে।

পাস্তা রান্না

একটি বড় মাইক্রোওয়েভ-সেইফ বাটিতে পাস্তা এবং পর্যাপ্ত পানি দিন। প্রতি ১০০ গ্রাম পাস্তার জন্য তিন কাপ পানি প্রয়োজন। ১০ মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন, মাঝে দুই-তিনবার নেড়ে দিন। রান্না শেষ হলে পানি ঝড়িয়ে নিন।

ইনস্ট্যান্ট নুডলস আপগ্রেড

ইনস্ট্যান্ট নুডলসকে আরও স্বাস্থ্যকর করতে কিছু সবজি যোগ করুন। নুডলসের সাথে কুচি করা গাজর, বীন্স এবং মটরশুটি দিন। প্রয়োজনমতো পানি যোগ করে রান্না করুন। এই ছোট্ট টিপসটি আপনার নুডলসকে করে তুলবে আরও পুষ্টিকর।

সূপ এবং স্টু তৈরির টেকনিক

দ্রুত সূপ তৈরি

একটি বড় মাইক্রোওয়েভ-সেইফ বাটিতে প্রিয় সবজি কুচি করুন। উপরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি এবং মসলা দিন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ১০-১২ মিনিট হাই পাওয়ারে রান্না করুন। রান্নার মাঝে দুই-তিনবার নেড়ে দিন।

ক্রিমি সূপ

যদি ক্রিমি সূপ পছন্দ করেন, সূপ রান্না শেষে কিছু ক্রিম বা দুধ যোগ করুন। ভালোভাবে মিশিয়ে আরও এক মিনিট গরম করুন। এই পদ্ধতিতে সূপের স্বাদ আরও ক্রিমি হবে।

স্টু রান্না

স্টু রান্নার জন্য বেশি সময়ের প্রয়োজন। মাইক্রোওয়েভে স্টু রান্না করতে মিডিয়াম পাওয়ার ব্যবহার করুন এবং সময় নিন ১৫-২০ মিনিট। প্রতি পাঁচ মিনিট পর নেড়ে দিন যাতে সব উপকরণ সমানভাবে রান্না হয়।

বেকিং এর টিপস

মাগ কেক

মাইক্রোওয়েভে তৈরি একটি সুস্বাদু এবং আকর্ষণীয় চকলেট মাগ কেক।

একটি বড় মাগ নিন। শুকনো উপকরণ (ময়দা, চিনি, কোকো পাউডার) মিশিয়ে নিন। তারপর ভেজা উপকরণ (দুধ, তেল, ডিম) যোগ করুন। ভালোভাবে মিশিয়ে ২-৩ মিনিট মিডিয়াম-হাই পাওয়ারে বেক করুন। কেক ফুলে উঠলে এবং স্পঞ্জের মতো হালকা হলে বুঝবেন তৈরি।

কুকিজ

মাইক্রোওয়েভ-সেইফ প্লেটে কুকির ডো সাজান। কুকিগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন। ১-২ মিনিট মিডিয়াম পাওয়ারে বেক করুন। কুকি গোল্ডেন ব্রাউন হলে বের করে নিন।

ব্রেড পুডিং

বাসি ব্রেডের টুকরো একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ ডিশে সাজান। ডিম, দুধ, চিনি এবং ভ্যানিলা দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে ব্রেডের উপরে ঢালুন। ৫-৭ মিনিট মিডিয়াম পাওয়ারে বেক করুন।

সময় বাঁচানোর হ্যাকস

একসাথে অনেক খাবার রান্না

মাইক্রোওয়েভের বিভিন্ন লেভেল ব্যবহার করে একসাথে অনেক খাবার রান্না করতে পারেন। নিচের তাকে তরল খাবার, উপরের তাকে শক্ত খাবার রাখুন। এই পদ্ধতিতে আপনি একই সময়ে ভাত, ডাল এবং সবজি রান্না করতে পারবেন।

প্রিপ এবং ফ্রিজ

সপ্তাহের শুরুতে বেশি পরিমাণে খাবার রান্না করে ফ্রিজে রাখুন। পরে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খান। এই পদ্ধতিতে প্রতিদিন রান্নার সময় বাঁচবে।

দ্রুত ডিফ্রস্টিং

হিমায়িত খাবার দ্রুত ডিফ্রস্ট করতে মাইক্রোওয়েভের ডিফ্রস্ট setting ব্যবহার করুন। প্রতি ৫০০ গ্রাম খাবারের জন্য ৩-৪ মিনিট সময় দিন। মাঝে মাঝে নেড়ে দিন যাতে সমানভাবে ডিফ্রস্ট হয়।

স্বাদ বাড়ানোর টেকনিক

মসলা টোস্টিং

মাইক্রোওয়েভে মসলা টোস্ট করতে পারেন। একটি মাইক্রোওয়েভ-সেইফ প্লেটে মসলা ছড়িয়ে দিন। ৩০ সেকেন্ড পর পর নেড়ে ১-২ মিনিট গরম করুন। এই পদ্ধতিতে মসলার aroma বের হবে।

রসুন পিল করা

মাইক্রোওয়েভে সামান্য গরম করার পর সহজেই রসুনের খোসা ছাড়ানো হচ্ছে।

রসুন পিল করা সহজ করতে রসুনের কোয়া মাইক্রোওয়েভে ১০-১৫ সেকেন্ড গরম করুন। বের করে নিলেই দেখবেন খোসা সহজেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

লেবুর রস বের করা

লেবু থেকে বেশি রস পেতে এটি মাইক্রোওয়েভে ১০-১৫ সেকেন্ড গরম করুন। গরম হলে লেবু নরম হবে এবং রস সহজে বের করা যাবে।

স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতি

কম তেলে রান্না

মাইক্রোওয়েভে রান্না করতে কম তেলের প্রয়োজন হয়। এটি আপনার রান্নাকে করে তুলবে আরও স্বাস্থ্যকর। তেলের পরিবর্তে পানির ভাপ ব্যবহার করুন।

পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ

অন্যান্য রান্নার পদ্ধতির তুলনায় মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ বেশি সংরক্ষিত থাকে। কম সময় এবং কম পানিতে রান্না হওয়ায় ভিটামিন এবং মিনারেলের ক্ষয় কম হয়।

ফ্যাট কমিয়ে দেওয়া

মাংস রান্নার সময় অতিরিক্ত ফ্যাট ঝরাতে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করুন। মাংস একটি র্যাকের উপর রাখুন, নিচে একটি পাত্র রাখুন ফ্যাট জমার জন্য। এই পদ্ধতিতে মাংসের ফ্যাট ঝরে পড়বে।

সাধারণ সমস্যা এবং সমাধান

খাবার সমানভাবে রান্না হয়

এই সমস্যা সমাধানে খাবারকে সমান পুরুত্বের টুকরো করে কাটুন। রান্নার মাঝে নেড়ে দিন। রিং আকারে সাজান।

খাবার শুকিয়ে যায়

খাবার শুকিয়ে যাওয়া রোধ করতে ঢাকনা ব্যবহার করুন। প্রয়োজনমতো পানি যোগ করুন। কম পাওয়ারে বেশি সময় দিন।

খাবার ফেটে যায়

তরল খাবার ফেটে যাওয়া রোধ করতে পাত্র সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করবেন না। বাষ্প বের হওয়ার জন্য জায়গা রাখুন। interrupted method ব্যবহার করুন।

উপসংহার: মাইক্রোওয়েভ রান্নার

মাইক্রোওয়েভ রান্না কোনো জটিল বিজ্ঞান নয়, এটি  কিছু সাধারণ টেকনিক এবং সামান্য অভ্যাসের মাধ্যমে আপনি এই যন্ত্রটিকে করে তুলতে পারেন আপনার রান্নার সবচেয়ে কার্যকরী সহকারী। সময় বাঁচানো থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর রান্না—মাইক্রোওয়েভের সুবিধা অনেক।

আজই এই হ্যাকসগুলো প্রয়োগ করে দেখুন। প্রথমে ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু করুন, Gradually যেকোন রেসিপি নির্বাচন করুন। মনে রাখবেন, প্রতিটি নতুন জিনিস সময় এবং অভ্যাসের demands。 ধৈর্য্য ধরুন, চেষ্টা চালিয়ে যান। শীঘ্রই আপনি দেখবেন, মাইক্রোওয়েভ রান্না আপনার জন্য হয়ে উঠেছে একটি আনন্দের উপকরন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *